২৪ মে, ২০২৩ ০৯:০৮ পিএম

স্বাস্থ্য বাজেট: বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়ে জরুরি সঠিক ব্যবহার 

স্বাস্থ্য বাজেট: বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়ে জরুরি সঠিক ব্যবহার 
বাজেট খরচ না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদ খালি থাকা। বাংলাদেশে তৃতীয় শ্রেণীর মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের প্রায় ২৭ শতাংশ পদ এখনো খালি আছে। ছবি: সাদ্দাম হোসাইন, গ্রাফিক্স: এস এম আব্দুল্লাহ

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি দেশের বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ কথা থাকলেও বাংলাদেশে ৫ শতাংশের কাছাকাছি। আবার দেখা যাচ্ছে নানা কারণে এই ৫ শতাংশ বরাদ্দের একটা বড় অংশ খরচ করা সম্ভব হচ্ছে না। আইটেম অনুযায়ী বাজেট হওয়ায় এ সমস্যা হয়।

মেডিভয়েসের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে এসব কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাসরিন সুলতানা। 

বাজেটের যে অংশ খরচ হয় না

স্বাধীনতার পর থেকেই স্বাস্থ্য খাতের বাজেট ৫ শতাংশের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে। সে তুলনায় বাজেটটা অনেক কম। বাজেটের দুটি অংশ থাকে, যথা—রাজস্ব বাজেট ও উন্নয়ন বাজেট। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নানা কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন বাজেটের একটা বড় অংশ খরচ হয় না। এর পরিমাণ ২৫-৩৫ শতাংশ। ফলে প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার পর একটা অংশ বলেন স্বাস্থ্য খাতে বাজেট অনেক কম দেওয়া হয়েছে। আবার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, যে বাজেট দেওয়া হয়েছে তা থেকেই তো খরচ হয় না, তাহলে অতিরিক্ত বাজেট দিয়ে লাভ কি?

যে কারণে বরাদ্দ খরচ হয় না

শুধু বাজেটের আকার বাড়লেই যে ভালো সেবা পাওয়া যাবে তা না, বরং সঠিক উপায়ে এটি খরচ করতে হবে। বাজেট খরচ না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদ খালি থাকা। বাংলাদেশে তৃতীয় শ্রেণীর মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের প্রায় ২৭ শতাংশ পদ এখনো খালি আছে। চতুর্থ শ্রেণীর পোস্ট খালি আছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। হাসপাতালগুলোতে মেশিন থাকলে মেশিন চালানোর মতো লোকবল নেই, আবার কিছু ক্ষেত্রে মেশিন চালানোর লোক আছে, কিন্তু মেশিন নেই। এই যে শূন্যটা এটা পূরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেশিন ক্রয় করার পাশাপাশি সেগুলো চালানোর জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে, যেখানে লোকবল বেশি প্রয়োজন সেখানেই পদ খালি পড়ে আছে। এটা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় ধরনের সমস্যা।

বেসরকারিতে চিকিৎসা ব্যয় বেশি

ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্ট-২০২০ অনুযায়ী, বাংলাদেশে যে হেলথ ফাইনান্সিং হচ্ছে তার ৬৯ শতাংশ ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হচ্ছে। সেখানে সরকারের খরচ মাত্র ২৩ শতাংশ। সরকারের তরফ থেকে খরচের দিক থেকে এ পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হওয়া ৬৯ শতাংশের একটা বড় অংশ যাচ্ছে ওষুধে, এরপর প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খরচ হচ্ছে প্রায় ১২ শতাংশের মতো। অবশ্য ব্যক্তির পকেট এত বড় একটা অংশ খরচ হওয়ার অন্যতম কারণ, আমাদের দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ কারণে ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ অনেক বেশি।

বাজেট খরচে অনভিজ্ঞতা

স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দ ও খরচ কম হওয়ার অন্যতম কারণ শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ না হওয়া। কোনো কোনো হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হলেও সে অনুপাতে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বাজেট তৈরি ও খরচে প্রশিক্ষণের অভাবে মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলগণ সঠিকভাবে কাজটা করতে পারেন না। আর বাজেট শুধু দিলেই হয় না, বাজেটটা প্রয়োজনের ভিত্তিতে হতে হয়। অনেক সময় ইউএইচএফপিও, সিভিল সার্জন—যাদেরকে বাজেট ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তারা কিছুদিন পর বদলি হয়ে যান। ফলে তিনি যে প্রশিক্ষণ নিলেন সেটি অন্যদের মাঝে বুঝিয়ে দিতে পারেন না এবং যারা বাজেট করেন তাদের সে পরিমাণ অভিজ্ঞতা না থাকায় বাজেট কম হয়ে যায়।

সমাধান মিলবে যেভাবে

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজেট বাড়ানোর প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন এই স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, এর চেয়ে বরং জরুরি হচ্ছে বাজেট যতটুকুই বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার সঠিক ব্যয় নিশ্চিত করা। আরেকটা বিষয়, আমাদের দেশে বাজেট দেওয়া হয় আইটেম অনুযায়ী, এক আইটেমের বাজেট অন্য আইটেমে খরচ করা যায় না। সরকার যদি এ জায়গায় একটু শিথিলতা আনে অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী এক আইটেমের বাজেট থেকে অন্য আইটেমে খরচ করার সুযোগ করে দেয় তাহলে সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।

রোগীদের বিদেশমুখিতা রোধে যা জরুরি

আমাদের দেশের একটা বড় অংশ সামান্য অসুস্থতায় চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যান। এ কারণে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যাগুলো নজরে আসে না। করোনার সময় দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না, তখন বেশ ভালোভাবেই স্বাস্থ্যখাতের সমস্যাগুলো উঠে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো চিহ্নিত করে সমাধানেরও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু করোনা সংকট শেষ হওয়ায় আবার এই শ্রেণীটি বিদেশ যাওয়া শুরু করেছে। এটা বন্ধ করতে হবে। 
এটা রোধ করতে পারলে বিদেশে যে টাকাগুলো চলে যায়, সেগুলো দেশে ব্যয় করা যাবে এবং স্বাস্থ্যখাতের সমস্যাগুলো আরও ভালোভাবে সমাধান করা যাবে।

এসএস/এমইউ

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : স্বাস্থ্য বাজেট
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত